
মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসানের ১৭টিতে সরাসরি জামায়াতের প্রার্থী ও দুটি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার সব আসনে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শরিক দল এনসিপি। গাইবান্ধা জেলার ৫ আসনের মধ্যে ৪ টিতে জামায়াত আর মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। ফলে রংপুর বিভাগের রাজনীতিতে সাংগঠনিক সক্ষমতা, সময়োচিত কৌশল, প্রার্থী নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ এবং তৃণমূল সক্রিয়তার ঘাটতি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে রংপুর বিভাগে মাত্র একটি করে আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি দলটি। সেদিক থেকে ২০২৬-এর ফলাফল বিবেচনায় দেখা যায় এ অঞ্চলে জামায়াত নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করলেও অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে বিএনপি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রংপুর বিভাগে যোগ্য ও বিচক্ষণ নেতার অভাব প্রকট। এখানে এমন নেতা প্রয়োজন, যার সুচিন্তিত নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে। যিনি হবেন ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিত্ব এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য।নীলফামারী-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭৯ ভোট পেয়ে মাত্র ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও তার প্রাপ্ত ভোট স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতীতে এ আসনে দলের ভোটসংখ্যা যেখানে গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে তার দূরদর্শী নেতৃত্বে মাত্র ২০ থেকে ২২ দিনের প্রচারণায় তা বাড়িয়ে প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি নিতে সক্ষম হন। সংগঠিত শক্তি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এক বছর ধরে মাঠে সক্রিয় থাকলেও তার প্রচারণা তাদের শক্ত ভিত নড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, নীলফামারী-২ আসনে এসে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চোধুরী তুহিন বিভক্ত সংগঠনকে স্বল্প সময়েই ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। স্বল্প সময়ের প্রচারণায় ভোটের ব্যবধান কমানো, বিভক্ত সংগঠনকে একত্র করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়ানোর সক্ষমতার কারণে তাকে বিভাগজুড়ে সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব হিসেবে দেখছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, তাকে বিশেষ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হলে রংপুর বিভাগজুড়ে দলটি শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারে। কারণ নীলফামারী জেলা অঞ্চলে ধানের শীষ প্রতীক ততটা পরিচিত নয়; বরং নৌকা, দাঁড়িপাল্লা ও লাঙল প্রতীকই ভোটারদের কাছে বেশি পরিচিত ছিল। এ বাস্তবতায় স্বল্প সময়ে ভোট বাড়িয়ে তিনি সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। স্থানীয়দের ধারণা, আগে থেকে মনোনয়ন নিশ্চিত করা হলে মাঠপর্যায়ে বেশি সময় কাজ করার সুযোগ পেলে শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন বিপুল ভোটে জয় পেত।
বিশেষ করে নীলফামারী-১ আসনে তার দীর্ঘ ২৫ থেকে ৩০ বছরের সাংগঠনিক কাজ ও তৃণমূল শক্তিশালী করার ভূমিকা নিয়ে বিভাগজুড়ে আলোচনা চলছে। ওই আসনে জোটগত সমঝোতার কারণে নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি আসনটি ছেড়ে দেন বলে জানান নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, ত্যাগ, সংগঠন দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সমন্বয়ে তিনি এমন একজন নেতা, যাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিলে হারানো আসন পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ফল আসবে। তাই তৃণমূল থেকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত কর্মীদের প্রত্যাশা, তাকে আগামী পাঁচ বছর কাজের সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে নির্বাচনি ফলে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয় পাবে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় রংপুর বিভাগ এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে শক্ত সংগঠন গড়ে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে রংপুর বিভাগে দলীয় প্রভাব বাড়াতে সংগঠন পুনর্গঠন, তৃণমূল সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে আনার অংশ হিসেবে শাহরিন ইসলাম তুহিনকে রংপুর বিভাগের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে, যা নিয়ে দলীয় অঙ্গন থেকে সাধারণ ভোটার পর্যন্ত আলোচনা চলছে।
স্থানীয়দের মতে, রংপুর অঞ্চলে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে হলে বিএনপিকে নতুন কৌশল নিতে হবে এবং মাঠভিত্তিক নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে। কিছু এলাকায় জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন শক্তিশালী করে রেখেছে। এসব এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে হলে বিএনপির প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। নেতাকর্মীদের দাবি, ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন এই তিন ক্ষেত্রেই তুলনামূলক এগিয়ে। নির্বাচনে দুর্বল ফলাফলের পেছনে প্রধান কারণগুলোর একটি ছিল প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দেরি ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। বিশেষ করে নীলফামারী জেলা কমিটি তিন ভাগে বিভক্ত থাকায় মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। উপজেলা পর্যায়ের নেতাকে জেলার দায়িত্বে রাখা হয়, ফলে সাংগঠনিক ঐক্য গড়ে ওঠেনি। এতে কর্মীদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয় এবং নির্বাচনি প্রচারণা কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ে।
স্থানীয় রাজনীতিকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে প্রার্থী ঘোষণায় বিলম্ব। নীলফামারী-২ আসনে ভোটের মাত্র ২০ দিন আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করে বিএনপি। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতে ইসলামী প্রায় ছয় মাস আগে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নেমে পড়ে। দলটি প্রচারের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়ায় ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ায় এবং স্থানীয় ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। যেখানে বিএনপির প্রার্থী সময় স্বল্পতার কারণে সব ভোটারের কাছে পৌঁছাতেই পারেননি। স্থানীয় নেতাদের আরেকটি অভিযোগ, নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় ভোটের দিন সাংগঠনিক শক্তি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। রংপুর অঞ্চলে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলাতে হলে বিএনপিকে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি মাঠকেন্দ্রিক কৌশল গ্রহণ না করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
স্থানীয়দের মতে, রংপুর বিভাগের রাজনৈতিক চিত্র এখন পরিবর্তনের একটি পর্যায়ে রয়েছে। এ অঞ্চলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে হলে বিএনপিকে স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ, তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করা এবং ভোটারভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সময়মতো পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলতে পারলে রংপুর বিভাগে ক্ষমতার সমীকরণ বদলানো অসম্ভব নয়।রংপুর বিভাগে বিএনপির ভরাডুবি বিশেষ করে নীলফামারী-২ (সদর) আসনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয় ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং জেলার রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনকে রংপুর বিভাগের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নীলফামারীর আপামর জনতা ও ছাত্রসমাজ।
নীলফামারী জেলার উন্নয়ন মঞ্চের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবীব লেলিন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি নীলফামারীর উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনি মারপ্যাঁচে নীলফামারীবাসী তাদের প্রিয় নেতাকে সংসদে পাঠাতে না পারলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাকে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। নীলফামারীর মাটি ও মানুষের নেতা তুহিন চৌধুরীকে রংপুর বিভাগের বিশেষ দায়িত্ব দিলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়বে এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে তুহিনের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে নির্বাচনে জয়ী করে আনতে পারিনি সত্য, কিন্তু নীলফামারীর লাখ লাখ মানুষের উন্নয়ন আর রাজনৈতিক অধিকারের স্বার্থে তাকে মন্ত্রিসভায় দেখতে চাই। আমরা আশা করি, আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান নীলফামারীর এ ন্যায্য দাবিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
এদিকে ডিমলা উপজেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আশিকুর রহমান আকিক অভিযোগ করে বলেন, নীলফামারী বরাবরই অবহেলার শিকার, তার ওপর দলীয় উচ্চপর্যায়ের ভুল ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সারা দেশে যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিজয়ের ধারা, তখন নীলফামারী জেলায় ভরাডুবির দায় কার? তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ মাস ধরে যিনি নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে তৃণমূল সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন, শেষ মুহূর্তে তাকে নীলফামারী-২ আসনে মনোনয়ন দেওয়ায় পুরো প্রস্তুতি ভেঙে পড়ে। ‘২৬ দিনে ১৮ মাসের প্রস্তুতির বিকল্প হয় না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি দাবি করেন, এ সিদ্ধান্ত শুধু একজন নেতার প্রতি নয় বরং ডোমার-ডিমলা উপজেলা ও পুরো জেলার রাজনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং তৃণমূল কর্মীদের মনোবল দুর্বল করেছে। তাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জেলাকে শক্তিশালী করতে তুহিন চৌধুরীকে টেকনোক্রাট মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এতে নীলফামারীর প্রতি হওয়া ক্ষতির আংশিক হলেও প্রতিকার সম্ভব হবে।



