মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
ঢাকার আশুলিয়ায় ডেকো গ্রুপের আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায় কর্মস্থলে সুমি আক্তার ওরফে মিশু (২৬) নামে এক নারী পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল এই মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং নিহতের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। ঘটনার প্রেক্ষাপট, ঘটনার তারিখ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার বিকেলে আশুলিয়ার এলাকায় অবস্থিত আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায় এই ঘটনা ঘটে।
সিসিটিভি ফুটেজ: কারখানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সুইং অপারেটর সুমি আক্তার মেশিনে কাজ করার সময় এক পুরুষ কর্মকর্তা তার দিকে বারবার তেড়ে যাচ্ছেন, তার মেশিনে আঘাত করছেন এবং তার সঙ্গে তীব্র দুর্ব্যবহার করছেন। এর পরপরই সুমি মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে মারা যান। স্বজন ও সহকর্মীদের অভিযোগ: সুমি আক্তার আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি। উল্টো কাজের চাপ সৃষ্টি করে তাঁর ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের মূল দাবিগুলো:
১. নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার: সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান অভিযুক্ত কর্মকর্তার দুর্ব্যবহার ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: কারখানার ফ্লোরে শ্রমিকদের ওপর যেকোনো ধরনের মানসিক ও শারীরিক হয়রানি, গালিগালাজ কিংবা জোরপূর্বক অতিরিক্ত খাটানো বন্ধ করতে হবে।
৩. উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ: নিহতের পরিবারকে আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সব বকেয়া পরিশোধ এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ছুটি ও মানবিক অধিকার রক্ষা: শ্রমিকরা অসুস্থ হলে তাদের যথাযথ চিকিৎসার্থে ছুটি প্রদান এবং শ্রম আইন অনুযায়ী মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
তদন্ত ও মামলা: ঘটনার পর সুমির স্বামী সাজ্জাদ হোসেন আশুলিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্ত করছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সুমির মৃত্যু হয়েছিল। বিষয়টি স্বজনদের না জানিয়ে মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ তাদের। এ নিয়ে হাসপাতালে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বজনদের বিরোধ বাধে। পরে লাশ হস্তান্তর নিয়ে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরোধ ও ধস্তাধস্তি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। নিহত সুমি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খোকড়াহাট এলাকার বজলুর মিয়ার মেয়ে। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। আগামী ফ্যাশন লিমিটেডে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা: ঘটনার পর সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ফ্লোরের লাইন সুপারভাইজারকে অব্যাহতি দেওয়ার লক্ষ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। সুমির এমন করুন মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ডিমলা উপজেলাসহ তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষী এবং দেশের মধ্যে।