লিখেছেন: হাফিজ মাওলানা মুফতী ছালিম আহমদ খাঁ
সংগঠক ও সমাজকর্মী
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণেই দেশের তরুণ সমাজ, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ, অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়। এই আন্দোলনে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং মাদ্রাসা ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করে তুলেছেন।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও গণআন্দোলনের ইতিহাসে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের পূর্বধারণা প্রচলিত ছিল। অনেকের ধারণা ছিল, তারা জাতীয় রাজনীতি বা গণআন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত নন; বরং ধর্মীয় শিক্ষার পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ থাকেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাদের অংশগ্রহণ সেই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।
আলিয়া ও কওমি—উভয় ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, যশোর, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও তাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই অংশগ্রহণ আন্দোলনের পরিধি ও বৈচিত্র্যকে আরও বিস্তৃত করেছে।
তাদের অংশগ্রহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শৃঙ্খলা ও সংগঠিত উপস্থিতি। সারিবদ্ধভাবে পদযাত্রা, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রিত আচরণ অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এসব কর্মকাণ্ড তাদের মধ্যে সংগঠনশৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা আত্মসংযম, শৃঙ্খলা ও ত্যাগের মানসিকতার জন্য পরিচিত। আন্দোলনের সময়ও অনেকে ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, কেউ খাবার ও পানীয় বিতরণ করেছেন, আবার কেউ আহতদের সেবায় এগিয়ে এসেছেন। এসব মানবিক উদ্যোগ আন্দোলনের সামাজিক সংহতি জোরদার করতে সহায়ক হয়েছে।
তাদের অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নৈতিক অবস্থান। অনেক শিক্ষার্থী ন্যায়বিচার, সততা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে এনে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে তারা আন্দোলনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, যা সমাজের একটি অংশের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা, লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানে গ্যাসের মতো পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী কর্মসূচিতে অটল ছিলেন। তাদের এই দৃঢ়তা অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের অভিমত।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে মসজিদ ও মাদ্রাসা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ ও আলোচনা বৃদ্ধি পায়।
ইতিহাসের দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন জাতীয় সংকটে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদান নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাদের অংশগ্রহণ সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতি নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একসময় তাদের সম্পর্কে ধারণা প্রচলিত ছিল যে তারা কেবল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক । এই আন্দোলনে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তারা সরাসরি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রচার, সচেতনতামূলক প্রচারণা, সৃজনশীল পোস্টার ও ভিজ্যুয়াল তৈরি এবং বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে তাদের দক্ষতা আন্দোলনের বার্তা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আন্দোলনে মাদ্রাসা, প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি দৃশ্যমান ঐক্য গড়ে ওঠে। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও তারা অভিন্ন কিছু দাবিকে সামনে রেখে একসঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন। এই সমন্বয় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা—এই তিন ধারার সমন্বয় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের তরুণসমাজ কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়, বর্তমানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যখন একটি অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে একত্রিত হন, তখন জাতীয় পরিসরে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
সর্বোপরি, এই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের একটি অধ্যায় নয়; এটি তরুণদের ঐক্য, নাগরিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। ভবিষ্যতে এ আন্দোলনের ইতিহাস রচিত হলে মাদ্রাসা, প্রাইভেট ও পাবলিক সব ধারার শিক্ষার্থীদের অবদান যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়িত হবে এটাই প্রত্যাশা।