মো: জাহিদুল ইসলাম, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় ঝড় ও বড় আকারের ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। ফলে উপজেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাত ১২টার পর শুরু হওয়া এই দুর্যোগে কৃষি খাতের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি বসতভিটা ও গাছপালারও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
ডিমলা উপজেলা সদরসহ গয়াবাড়ি, বালাপাড়া, পশ্চিম ও পূর্ব ছাতনাই, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি, নাউতারা, টেপাখরিবাড়ি এবং খগাখরিবাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ দমকা হাওয়া শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে তা তীব্র ঝড়ে রূপ নেয় এবং সঙ্গে শুরু হয় বড় আকারের শিলাবৃষ্টি। স্থানীয়রা বলেন, একেকটি শিলার ওজন ছিল প্রায় ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম। যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অত্যন্ত বিরল ও ভয়াবহ।
এই শিলাবৃষ্টির আঘাতে আম ও লিচুর মুকুল ব্যাপকভাবে ঝরে পড়ে। পাশাপাশি গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ ও বিভিন্ন শাকসবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই জমির ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে ভুট্টা ও মরিচের ক্ষেত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৭৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ভুট্টা ৫০ হেক্টর, গম ১০ হেক্টর, মরিচ ১২ হেক্টর এবং শাকসবজি ৩ হেক্টর জমি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ চলমান রয়েছে এবং চূড়ান্ত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গয়াবাড়ি ইউনিয়নের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, তিন বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, যার বেশিরভাগই ঋণ। এক রাতের ঝড়েই সব শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
নাউতারা ইউনিয়নের কৃষক আমিনুর রহমান ও সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ তিতপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল্লাহ বলেন, তারা ঋণ নিয়ে ফসল আবাদ করেছিলেন। হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে তাদের অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ডিমলা উপজেলার কৃষক হাসানুল ইসলাম বলেন, ঝড়ের সঙ্গে বড় বড় শিলা পড়তে শুরু হয়, কয়েক মিনিটেই সব শেষ হয়ে গেছে। জমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। আলুতে আগে ক্ষতি, এখন আবার অন্য ফসলও শেষ। ডিমলা সদরের হাবিবা নার্সারির পরিচালক শাহজাহান ইসলাম বলেন, তার নার্সারির চারা গাছ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা খুব কঠিন। সরকারি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।স্থানীয়রা জানায়, গত ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে এত বড় আকারের শিলাবৃষ্টি এই এলাকায় দেখা যায়নি। অনেকের বসতঘরের টিনের চালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গাছপালা ভেঙে পড়েছে।
ডিমলা উপজেলার আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর সবুর বলেন, রাতে কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি হয়। আগামী কয়েকদিন ঝড় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, বীজ ও সার সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা দ্রুত পুনরায় চাষাবাদ শুরু করতে পারেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, `ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কৃষির পাশাপাশি অনেক পরিবারের ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে।