মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
শীত মৌসুম এলেই নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ফুটে ওঠে হলুদ সরিষা ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য। হলুদের চাদরে মোড়ানো মাঠ, তার ফাঁকে ফাঁকে সবুজ সরিষার শীষ আর শীতের হিমেল বাতাসে দোল খাওয়া ফুলে মৌমাছির গুঞ্জন সব মিলিয়ে এক অনন্য নৈসর্গিক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে সরিষার ক্ষেত।
এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। শুধু ডিমলা উপজেলা নয়, নীলফামারী জেলা জুড়েই এখন সরিষা ফুলে ভরে আছে কৃষকের মাঠ।
কাঁচা সরিষার ফুলের মৌ মৌ গন্ধে আর মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত চারপাশ। সরিষা ফুল শুধু সৌন্দর্যই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ফেলছে ইতিবাচক প্রভাব। ভালো ফলন ও বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।
কৃষকেরা জানান, বিগত বছরগুলোতে সরিষা আবাদে লাভ হওয়ায় চলতি মৌসুমেও তারা ব্যাপকভাবে সরিষার চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ না হলে এ বছরও ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। কৃষকদের মতে, উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা রপনের মাত্র ৫৫-৬০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। আমন ধান কাটার পর জমিতে বীজ ছড়িয়ে দিলেই সরিষা হয়ে যায়। তেমন সেচের প্রয়োজন হয় না। সরিষা তোলার পর সেই জমিতেই বোরো ধানের আবাদ করা যায়।
সরিষা গাছের পাতা মাটিতে ঝরে প্রাকৃতিক জৈব সারের কাজ করে, ফলে জমির উর্বরতা বাড়ে এবং পরবর্তী বোরো ধানে সারের প্রয়োজন অনেক কমে যায়। এতে ধান চাষের খরচও কমে আসে। ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া, পশ্চিম ছাতনাই, পূর্ব খড়িবাড়ি, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি, নাউতারা, গয়াবাড়ী, খগাখড়িবাড়ি, পূর্ব ছাতনাই, ডিমলা সদর ইউনিয়নের মাঠগুলো এখন হলুদ সরিষা ফুলে ভরে উঠেছে।
ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন,এ মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচসহ বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৯ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে বিঘাপ্রতি ৬-৭ মণ সরিষা পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি মণ ২৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব। কম খরচ ও কম পরিশ্রমে সরিষা আবাদ বেশ লাভজনক। পূর্ব খড়িবাড়ি চর এলাকার কৃষক আব্দুল সালাম বলেন,চর ও দোআঁশ মাটিতে সরিষা ভালো হয়। এ বছর ৩ বিঘা জমিতে সরিষা বুনেছি। গাছ ও ফুল ভালো হয়েছে। কোনো দুর্যোগ না হলে ফলন ভালো হবে।
গয়াবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিন গয়াবাড়ী এলাকার কৃষক বলেন আমিনুর রহমান , জাহেনুর রহমান ১৫০ বিঘা জমিতে সরিষা লাগিয়েছে ভালো দামের আশায় কম খরচে সরিষা ভালো ফলন পাওয়া যায় লাভ বেশি হয়।সরিষার পাশাপাশি ক্ষেতে মধু চাষেও আগ্রহ বাড়ছে মৌচাষিদের। আধুনিক পদ্ধতিতে মৌবাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন অনেকে। ভালো মানের মধু উৎপাদন হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এতে অনেক মৌচাষি স্বাবলম্বী হচ্ছেন। পাশাপাশি মৌমাছির পরাগায়নের ফলে সরিষার ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় ১৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর কৃষকেরা বেশি আবাদ করছেন উচ্চ ফলনশীল বারি-১৪, বারি-১৫, বারি-১৮ ও বারি-২০ জাতের সরিষা। এছাড়া সরিষা ক্ষেতে মৌবাক্স স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ কেজি মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মীর হাসান আল বান্না বলেন, এবছর সরিষা আবাদ ১৩৫০ হেক্টর। গতবছর সরিষা আবাদ ছিল ১৩২০ হেক্টর।। এবছর ৩০ হেক্টর জমিতে বিনা চাষে সরিষা আবাদ হচ্ছে। আমদানিনির্ভর ভোজ্যতেলের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ব্যয় বাড়ছে। ওষুধিগুণসম্পন্ন সরিষা তেলের চাহিদা বাড়ায় গত কয়েক বছর ধরে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরিষার আবাদ বাড়াতে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।