চলতি মাসের শেষের দিকেই দেশব্যাপী শুরু হতে যাচ্ছে হামের বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম। ইতোমধ্যে সরকারের ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। পার্বত্য রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা ব্যতীত দেশের বাকি সব জেলায় ইতোমধ্যেই প্রথম ধাপের হামের টিকা দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এসময় স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদিকদের সাথে কথা বলার আগে সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এবং নার্সদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন এবং সেবার মান বৃদ্ধি ও রোগীদের ভোগান্তি কমানোর বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক অগ্রগতি ও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি আমি দেশের প্রায় ২৫টিরও বেশি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। আমার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, গত ৬ মাসে দেশের প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে এবং চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত দেখতে পেয়েছি।” তিনি আরও জানান, রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে চিকিৎসকদের ব্যবহার, সেবার মান, খাবারের গুণগত মান, শয্যার পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক পরিবেশের ব্যাপক উন্নতি এসেছে।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে এই হাসপাতালেও চিকিৎসকদের সময়মতো আসা-যাওয়া ও সঠিক ডিউটি নিশ্চিত করা হবে। ড্রেনেজ বা পরিচ্ছন্নতার কোনো ত্রুটি থাকলে তা আগামী সাত দিনের মধ্যে সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিলেটে নির্মাণাধীন ও অনুমোদিত অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করে শিগগিরই চালুর স্পষ্ট ঘোষণা দেন তিনি।
স্বাস্থ্যখাতের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে প্রতি ১১ থেকে ১২ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন চিকিৎসক ও একজন নার্স সেবা দিয়ে থাকেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। বিগত সময়ের অনিয়ম দূর করে জনগণের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জানান, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার বাইরে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ ‘মপ-আপ’ ও জোরদার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। অসচেতনতা ও তথ্যের অভাবের কারণে অনেক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে। পূর্ববর্তী ক্যাম্পেইনে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো এবং ১ কোটি ৮৫ লক্ষ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিপুল সংখ্যক শিশুকে হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকা দেওয়া হলেও কিছু শিশু বাদ পড়ে যায় এবং তাদের মাঝেই হামের ঝুঁকি দেখা দেয়।
গত ২০ মে মূল ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর ২১ মে থেকেই বাদ পড়া শিশুদের জন্য ‘মপ-আপ’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে সিলেটসহ হাওড় ও দুর্গম এলাকাগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার বাইরেও হাজার হাজার নতুন শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিক থেকে পুন উদ্যামে এই বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালিত হবে।
সরকারি হাসপাতালে রোগীদের বিভ্রান্ত করে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া দালালচক্রের বিষয়ে মন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি জানান, সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা গুরুতর অপরাধ। এই চক্রকে নির্মূল করতে র্যাব, ডিজিএফআই ও এনএসআই-সহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিগত ১৭ বছরে জমে থাকা প্রশাসনিক জট বা অনিয়ম রাতারাতি বা ৬ মাসে পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলায় সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে।
হাসপাতাল পরিদর্শনকালে সিলেটের স্বাস্থ্যখাতে দৃশ্যমান ও বড় ধরনের রূপান্তরের ঘোষণা দেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, সিলেটে স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধিতে তিনটি প্রধান প্রকল্প চালুর কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে শিগগিরই একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল এবং ৪৫০ শয্যা বিশিষ্ট অসম্পূর্ণ থাকা ক্যান্সার ইনস্টিটিউটটি দ্রুত প্রস্তুত করে চালু করা হবে। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া পূর্বে ঘোষিত ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি চালুর প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রী আরও বলেন, সিলেটে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বিসিকের নানা উদ্যোগের সাথে সাথে এই স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো চালু হলে পুরো অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় এক বিরাট ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এ পরিদর্শনের সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরীসহ স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ