
মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
এসএসসি পরীক্ষায় ভয়াবহ নকল বাণিজ্যের চিত্র উঠে এসেছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় (বি-৬১৫) কেন্দ্রে। ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে প্রশ্নের উত্তর বেচাকেনা, মোবাইল ফোনে ‘লাইভ’ সমাধান পাঠানো এবং টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হতো বিশেষ সুবিধা। সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি সুসংগঠিত নকল সিন্ডিকেট। ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় খগাখড়িবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র (বি-৬১৫) ঘিরে এ চক্র সক্রিয় ছিল বলে উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে উঠে আসে।
এরপর তিন বছর পার হলেও বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত একটি সংগঠিত প্রতারণা। এই ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ডিমলার ওই কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা নকল সিন্ডিকেটের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও তা কার্যকরভাবে দমন করা হয়নি। বরং তদন্ত ও সুপারিশের পরও কেন্দ্র সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় ডিমলার খগাখড়িবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নকলের ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে পরবর্তীতে শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেনের পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্র সচিব, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, কক্ষ পরিদর্শক এবং বাইরের নকল সরবরাহকারীদের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কাজ করছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্র সচিব পরিকল্পিতভাবে কিছু নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীকে বিশেষ কক্ষে বসার ব্যবস্থা করতেন এবং সেই কক্ষগুলোতে নির্দিষ্ট শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হতো। এসব কক্ষে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ ব্যবহার করে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর সরবরাহ করা হতো।
২০২৩ সালের ৯ মে গণিত পরীক্ষার দিন তদন্ত কমিটি কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে তিন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন উদ্ধার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে আরও বড় চক্রের তথ্য। শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা ‘ফোন ধরবি তো মার খাবি’, ‘ফ্রেন্ডস অল টাইম’ এবং ‘কেউ মেসেজ দিলে গ্রুপ থেকে কিক দিব’ এমন কয়েকটি মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে প্রশ্নের সমাধান পেত এবং এর জন্য মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হতো। তদন্তে উঠে আসে, নির্ধারিত সিট প্ল্যান থাকা সত্ত্বেও কিছু শিক্ষার্থীকে রাতের আঁধারে অন্য কক্ষে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এ বিষয়ে কেন্দ্র সচিব মো. মোফাক্কারুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণও পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্র সচিবকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে নকল সিন্ডিকেটের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে খগাখড়িবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়কে আর এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার না করার সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জন্য বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে জনতা ডিগ্রি কলেজ এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে ডিমলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কেন্দ্র স্থানান্তরের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।এতসব গুরুতর অভিযোগ, প্রমাণ ও সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। এতে করে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কেন্দ্রে এত বড় নকল সিন্ডিকেট ধরা পড়ার পরও যদি কেউ শাস্তি না পায়, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে।
এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ওই ঘটনার তদন্ত ফাইল তলব করেন। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদন, সুপারিশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে কেন অসঙ্গতি রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সভায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘নীলফামারীর ডিমলায় খগাখড়িবাড়ি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নথিপত্র তলব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পরীক্ষার সময়ে যেকোন অনিয়ম দূর করতে সরকার বদ্ধপরিকর।


