ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন চলছে প্রার্থীদের প্রচারণা। বিভিন্ন স্থানে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের প্রচার চালাতে প্রতিপক্ষ বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ঘটছে হামলার ঘটনা। তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত নির্বাচনি সহিংসতায় চারজনের প্রাণ গেছে বলে পুলিশের হিসাব বলছে। এসব বাধা-হামলা ও হুমকি থেকে নারীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় বলে মত শিক্ষক, আইনজীবী ও রাজনীতিকদের।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ভোলার বোরহানউদ্দিনে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। আগের দিন নোয়াখালীতে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। এর একদিন আগে রাজধানীতে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ও এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নির্বাচনি গণসংযোগে বিএনপির সমর্থকরা ডিম ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই নির্বাচনি সহিংসতার ভুক্তভোগী হচ্ছেন নারীরাও। ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর কদমতলীতে নির্বাচনি গণসংযোগ চলাকালে জামায়াত নেত্রী কাজী মারিয়া ইসলাম বেবিকে যুবদলের নেতাকর্মীরা রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৮ জানুয়ারি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর মানিকায় ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইতে অস্বীকৃতি জানানোয় হাজেরা বেগম নামের এক নারীকে মারধর করেন যুবদল নেতা শাহাবুদ্দিন। সম্প্রতি, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে জামায়াত জোটের নারী কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়। এছাড়া, চুয়াডাঙ্গায় এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে জামায়াতের নারী কর্মীদের জামা-কাপড় খুলে নেওয়ার হুমকি দেন এক বিএনপি নেতা।
এসব নিয়ে কথা হলে রাজনীতিক, শিক্ষক ও আইনজীবীরা বলছেন, নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা ও হামলা সুষ্ঠু ভোটের পথে অন্তরায়। এগুলো জনমনে আতঙ্ক তৈরি করবে, ভোটারদের ভোটদানে ভাটা পড়বে। নারীদের নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে নোংরা চিন্তা ও মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মুখে নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের কথা বললেও যে অন্তরে ধারণ ও বাস্তবে লালন করা হয় না, এসব ঘটনা তারই প্রমাণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনি প্রক্রিয়ার জন্য এসব ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক ও নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের মধ্যে সংগঠিত সহিংসতা, সন্ত্রাস ও আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার নতুন প্রত্যাশার বিপরীত; বরং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘এগুলো খুবই নিন্দনীয়। যারা নির্বাচন চায় না, তারা এগুলো করছে। এমন ঘটনা পাকিস্তান আমলে ঘটতো। তখন মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মানুষ হত্যা করা হয়েছে। এখন আর মানুষ এগুলো চায় না।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিমের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার আছে। ভোট দেওয়ার ক্ষমতা সবার। সংবিধান অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। সে ক্ষেত্রে কোনো নারীকে কোনো রকম বাধা প্রদান সাংবিধানিক এবং আইনত অনুমোদিত নয়। শুধু নারীদের ক্ষেত্রে নয়ই, কারও ক্ষেত্রেই যে কোনো ধরনের বাধা অনুমোদিত নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের চলাফেরার অধিকার আছে। বাধা দেওয়া হলে তা আইনের চোখে অপরাধ। সেখানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এতদিন পর একটা ভোট হচ্ছে। মানুষ আশা করছে সুষ্ঠু ভোট হবে। ভোটের ক্ষেত্রে বাধা হলেও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করা উচিত।
বিএনপি নেতা, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রাত্তন কেন্দ্রীয় নেতা, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জননেতা মাহবুব চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের যখন আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, তখন সংশ্লিষ্ট দলগুলোর উচিত পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকে নির্বাচনী আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চালানো। কারণ এ ধরনের সহিংসতায় ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় পড়ে। গত ১৭ বছরের রুদ্ধ ও অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনীতিতে সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিএনপি একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায়।
এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অন্তরায় বলে জানান এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা মিতু। তিনি বলেন, ‘এগুলোর দায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে নিতে হবে। প্রার্থী ও তার সমর্থকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন স্তর একদিকে ঝুঁকে পড়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলো- যারা নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলেন, যারা নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে বড় বড় আয়োজন করে জ্ঞান দেন, আজকে তাদের মুখে কুলুপ এঁটেছেন। ইসলামপন্থি নারীরা নিগ্রহের শিকার বলে তারা কথা বলছেন না। অথচ তারাই আবার বলবেন, হুজুররা নারীদের ঘর থেকে বের হতে দেয় না। নিরাপত্তা না দিলে, তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার না হলে কীভাবে তারা ঘর থেকে বের হবেন? নিপীড়কের পাশাপাশি চুপ থেকে যারা নারী নিপীড়নের বৈধতা দিচ্ছেন, তারাও সমান অপরাধী।