
মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
পলিনেট হাউস প্রযুক্তি কৃষিতে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার সফল উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
ডিমলার কুটিপাড়া গ্রামে সোহেল রানার পলিনেট হাউস প্রযুক্তি কৃষিতে উৎপাদিত বিভিন্ন সবজির চারা ক্ষেত্র পরিদর্শন করেন কৃষি কর্মকর্তারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান।পলিনেট হাউস, ইংরেজি এই শব্দটির ব্যাখা দাঁড়ায় কৃষিতে উন্নতমানের পলি অয়েল পেপারে আবৃত চাষযোগ্য কৃষিঘর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন উচ্চমূল্যের সব ধরনের ফসল ও চারা উৎপাদন করতে পারবে চাষিরা। সেই সঙ্গে তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলানো যায়। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ কৃষি উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। এমনি এক কৃষি উদ্যোক্তা যুবক সোহেল রানা। নীলফামারীর তিস্তা নদীবিধৌত ডিমলা উপজেলার কুটিপাড়া গ্রামে ব্যক্তিগতভাবে এই পলিনেট হাউস তৈরি করেছেন তিনি।
সেখানে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারি বৃষ্টিপাত, কীটপতঙ্গ, ভাইরাসজনিত রোগ, তীব্র তাপদাহ ইত্যাদির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সকল ধরনের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় ফসল নিরাপদ থাকবে। পলিনেট হাউসে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, রঙিন তরমুজ, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস ও অন্যান্য অসময়ের সবজির পাশাপাশি চারা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এছাড়া গ্রীষ্মকালেও ফলবে শীতকালীন সবজি। এর মধ্যে টমেটো, ফুলকপি, বেগুন, গাজর ইত্যাদি ফসল রয়েছে। এর ফলে এ সব সবজি চারা উৎপাদনে বৈচিত্র্য এনে আয়ের নতুন উৎসের সন্ধান খুঁজে নিয়েছে সোহেল রানা। তবে তিনি ২০ শতক জমি ঘিরে পলিনেট তৈরি করে ফসল উৎপাদনের চেয়ে বিষমুক্ত ফসলের চারা উৎপাদন করে বাজিমাত করেছেন। এতে গত দুই বছরে তিনি আয় করেছেন প্রায় ২০ লাখ টাকা।
সোহেল রানার ফসলের চারা উৎপাদনের পলিনেট হাউসটির কুটিপাড়া গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে। মৌসুমের নিয়ম ভেঙে এই পরিবর্তন এনেছেন গ্রামের এই সফল কৃষি উদ্যোক্তা। আধুনিক পদ্ধতির আপডেট স্মার্ট অ্যাগ্রো নামে পলিনেট হাউস তৈরি করে তিনি চারা উৎপাদন করে নিয়ে গেছেন এক নতুন ধারায়।
সোহেল রানা জানালেন তিনি লেখাপড়া করেছেন ইসলামের ইতিহাসে। অনার্স পাস করার পর আর মাস্টার্স শেষ করতে না পারলেও তিনি চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিতে মনোযোগ দেন। বিয়ে করেছেন। স্ত্রী রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করেছেন। দুই বছরের একটি ছেলে রয়েছে এই দম্পতির। স্বামী সোহেল রানার পলিনেট হাউস ঘিরে স্ত্রীর সহযোগিতা উল্লেখ করলেন সোহেল রানা। কথা বলে আরও জানা গেল দুই বছর আগে ২০ শতক জমিতে পলিথিন ও সূক্ষ নেট দিয়ে তৈরি নিয়ন্ত্রিত কৃষিঘর নির্মাণ করেন সোহেল রানা। ভেতরে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা আর আলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে ফুলকপি, পাতাকপি, টমেটো, বেগুন, পেঁপে, মরিচের চারার বৃদ্ধিও থাকে সমানুপাতিক। মাটির পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেন নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি কোকোপিট।
এতে থাকে না মাটিবাহিত রোগ, ভাইরাসের আক্রমণও কম। সোহেল রানা বললেন , কোকোপিটে চারার অঙ্কুরোদ্গমের হার ৯০ শতাংশের বেশি। সার বা কীটনাশক লাগে না। পলিনেট হাউসের চারা একসঙ্গে বেড়ে ওঠে, মৃত্যুহার কম, তাই ফলনও ভালো হয়। আগাম উৎপাদনের সুযোগ থাকায় মুনাফা বাড়ছে। ফলে, সারাবছর এখন সবজি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। তার বিষমুক্ত চারা যারাই নিয়ে ফসল উৎপাদন করেছেন তারাই পুনরায় চারা সংগ্রহণে তার কাছে ছুটে আসেন। সোহেল রানা আরও জানান, নিজে চাকরির পেছনে আর ছুটিনি। এখন নিজের কৃষি খামারে আমি চাকরি দিচ্ছি। এই উদ্যোগ বদলে দিয়েছে গ্রামের কর্মসংস্থানের চিত্র। সোহেলের পলিনেট হাউসে প্রতিদিন কাজ করেন ১৫ জন নারী-পুরুষ।
তাদের কেউ কেউ বলেন, আগে মৌসুম ছাড়া কাজ পাওয়া যেত না। এখন নিয়মিত আয় হচ্ছে, সংসারের খরচ মেটাতে পারছি। সাহেল রানা বলেন, বাবা যেহেতু কৃষক, তাই কৃষিতেই মনোনিবেশ করেছি নিজেকে। কৃষি দপ্তরের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ খরচে এই পলিনেট হাউস তৈরি করি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে। শুরু করা এই উদ্যোগ এখন তার প্রধান আয়ের উৎস। বছরে ২০ লাখের বেশি চারা উৎপাদন করেন তিনি। বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা নিট লাভ আসছে হাতে। শুধু তা-ই নয়, আগের মতো জমি আর খালি পড়ে থাকে না। নীলফামারীসহ আশপাশের জেলাগুলোয় নিয়মিত যাচ্ছে এসব চারা।
সোহেল বলেন, শুরুতে জানতাম না পলিনেট হাউস কতটা ফল দেবে। কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করি। এখন কোকোপিটে চারার অঙ্কুরোদ্গম ৯০ শতাংশের মতো। সার-কীটনাশক লাগে না বললে চলে। লক্ষ্য হচ্ছে, গ্রামে আধুনিক কৃষি পৌঁছে দেওয়া, যাতে সবাই সারাবছর আয়ের সুযোগ পায়। সোহেল রানার বাবা রেজাউল ইসলাম বলেন, আমরা সেই বাপ- দাদার আমলের রিতিতে চাষাবাদ করে আসছি। কোনোদিন ভাবিনি এখন বারো মাসেই সব ঋতুর চারা ও ফসল উৎপাদন করা যায়। আগে ভাবিনি এভাবে কৃষিকে বদলে ফেলা যায়। এখন ছেলেকে দেখে গ্রামের কৃষকরা নতুনরূপে উৎসাহ পাচ্ছে। কারণ, আবহাওয়া অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চারা উৎপাদন কৃষকদের জন্য বড় সুবিধা। রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ চারা উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি কার্যকর।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না জানান, সোহেল রানার উদ্যোগ দেখে অন্য কৃষকরাও পলিনেট হাউস করতে আগ্রহী হচ্ছেন। এটি এলাকায় একটি নতুন ধারা তৈরি করছে। অসময়ের ফসলের চারা উৎপাদন করে শুধু নিজের আয় বাড়াচ্ছেন না সোহেল রানা, পরিবর্তন আনছেন গ্রামের অর্থনীতি ও মানুষের ভাবনায়। প্রযুক্তি, পরিশ্রম আর সাহস মিলিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কৃষিতে উদ্ভাবনই ভবিষ্যতের নতুন পথ। এই কৃষি কর্মকর্তা জানালেন, কৃষি বিভাগের পক্ষে পলিনেট হাউস কৃষকদের তৈরি করে দেওয়ার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে কৃষি বিভাগ। আগামী বছর কিছু পলিনেট হাউস সোহেল রানার মতো উদ্যোক্তাকে তৈরি করে দেওয়া হবে।
যেখানে শুধু চারা না, বারো মাসের সব ঋতুর সবজি উৎপাদন করা যাবে। তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষে যে পলিনেট হাউস তৈরি করে দেওয়া হবে, সেখানে উন্নতমানের পলি ওয়ালপেপার ব্যবহার করা হবে। যা সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগেও ফসল থাকবে অক্ষত। এছাড়াও প্লাস্টিক দিয়ে বানানো এই ঘরে থাকবে ডিপ, ও স্প্রিংকুলার ইরিগেশনের সুবিধা। উৎপাদিত ফসলের প্রয়োজন ভেদে এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে জমিতে সেচ দেওয়া যাবে। এই প্রযুক্তিতে আরও থাকবে অত্যাধুনিক বালাইবিরোধী ব্যবস্থাপনার সুবিধা। যা কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পলিনেট হাউসের একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হয়ে দাঁড়াবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারাবছর উচ্চমূল্যের ফসল এবং ফুল-ফল ও সবজি চারা উৎপাদন করা যাবে এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদন সম্ভব হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে এটি করে দেওয়া হবে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিকভাবে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করব উদ্যেক্তাদের।



