
মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে উত্তরবঙ্গে প্রথম তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত আমির বলেন, তিস্তাতো এ অঞ্চলের মানুষের নিয়ামত ও অহংকার হওয়ার কথা ছিল। এখন তিস্তার নাম একসাগর দুঃখ। আমরা কথা দিচ্ছি, বঞ্চিত তিস্তা এলাকা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে ইসশাআল্লাহ।
নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের যৌথ আয়োজনে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার সীমানায় অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়াস্থ হেলিপ্যাড মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। কুড়িগ্রামের জনসভা শেষে দুপুর একটা ৩৫ মিনিটে জামায়াতে আমির হেলিকপটার যোগে ডালিয়ায় অবতরণ করেন। এ সময় আমিরে জামায়াতকে আগামী দিনের প্রধান মন্ত্রী আখ্যায়িত করে জনসভাস্থল শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে।জামায়াতের আমির বলেন, তিস্তার আর কঙ্কাল আর মরুভূমি থাকবে না। তিস্তা হবে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির কেন্দ্র বিন্দু ইনশাআল্লাহ। এখান থেকে হাইড্রো পাওয়ার হবে, এখানকার পানি সারা উত্তরবঙ্গকে উর্বর করে তুলবে। আর নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বছরের পর বছর হাজার হাজার পরিবারকে নিঃস্ব হতে হবে না। আমরা কথা দিচ্ছি যে কোন মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। কারো লাল চোখ আমরা পরোয়া করবো না। আমার দেশ আগে, এ দেশের জনগণের স্বার্থ আগে। আমরা কারো স্বার্থে আঘাত দিবোনা। কিন্তু আমাদের স্বার্থে কেউ এসে বাগরা দেবে তা আমরা মেনে নিবো না। এসময় আমিরে জামায়াত জনসভায় উপস্থিত সকলকে দুই হাত মজবুত করে ১১ দলের সাথে হাতে হাত রেখে থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, ১২ তারিখের পর ১৩ তারিখ হবে একটা নতুন সূর্য।
জনসভা স্থলে আমিরে জামায়াত আসার পূর্বেই জনসভাস্থলে তিস্তা অববাহিকার এলাকার নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার ৭টি সংসদীয় আসনের মানুষজন সকাল থেকে দলে দলে আসতে থাকেন। যা নিমিষেই জনসভাস্থল ছাড়িয়ে তিস্তা ব্যারাজের সড়ক পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেখা যায় লালমনিরহাট ৩ আসনের মানুষজন ৭০ কিলোমিটার, লালমনিরহাট ২ আসনের মানুষজন ৬৩ কিলোমিটার, লালমনিরহাট ১ আসনের মানুষজন ৩০ কিলোমিটার, নীলফামারী ১ আসনের মানুষজন ২০/৩০ কিলোমিটার ও নীলফামারী ৩ আসনের মানুষজন ২০ কিলোমিটার, নীলফামারী ২ ও ৪ আসনের ৫০/৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমিরে জামায়াতের বক্তব্য শুনতে ছুটে এসেছেন। জামায়াতের আমির তিনি অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গ গরিব নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে এই অঞ্চলকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। বলেন, সৎ মায়ের সন্তানের মতো উত্তরবঙ্গের সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে। অথচ এই উত্তরবঙ্গই বাংলাদেশকে খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করে। শফিকুর রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গ থেকে আগামী দিনে আর কোনো বেকারের মুখ দেখতে চাই না আমরা। প্রত্যেক যুবক-যুবতী ও নাগরিককে মর্যাদার কাজের মাধ্যমে দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এ লক্ষ্যে বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো সহ সকল শিল্পকলকারখানা চালু করে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র ফিরিয়ে আনা হবে।
যারা আধিপত্যবাদের গোলাম তাদের সাথেও নেই। আমরা আজাদীর বাংলাদেশের পক্ষ্যে। ইনশাআল্লাহ তিস্তাপারের মানুষজনের মতো জেগে উঠেছে এই বাংলাদেশের কোটি মানুষজন। আজাদী নিশ্চিত হবে, সেই বিজয় ইনশাআল্লাহ নিশ্চিত করতে চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে আমাদেরও বিজয়। ১৮ কোটি মানুষ হেরে গেলে আমাদেরও পরাজয়। এই জন্য বিজয়ের সূচনা হবে ইনশাল্লাহ গণভোটে ভোট দিয়ে। আমীরে জামায়াত বলেন, আপনারা গণভোটে কী বলবেন? ১২ তারিখ প্রথম ভোটটি হবে হ্যাঁ। সবাইকে নিয়ে। এই তিস্তাপাড়ে যারা আছেন সবাইকে নিয়ে। আপনারা যদি বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের ৩৩ আসনে ১১ দলের আমাদের প্রার্থীদের উপহার দেন আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে, আল্লাহ সুস্থ রাখলে, আল্লাহ যদি আমাদের হাতে দেশ গড়ার সুযোগ দেন ইনশাল্লাহ আপনাদের আস্থার প্রতিদান দেওয়ার জন্য আমরা লড়াই করে যাব। আপনাদের সাথে বেইমানি করব না। আপনাদের ন্যায্য যতগুলা পাওনা আছে- রাষ্ট্র আপনাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবে, ইনশাল্লাহ। আমরা বলতে চাই দেশের ৯ কোটি মা রয়েছেন। আমরা সকল মাকে নিরাপদে রাখবো। আমরা সবাই মিলে দেশটা গড়তে পারি। আমাদের দুটি ভোট। আমরা হ্যাঁ ভোটের আজাদি। যারা না ভোটে ছিল। তারা প্রথমে না ভোটের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। এখন তারা হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা করছে তাদের স্বাগতম। জামায়াতের আমির বলেন, আমি বিজয় চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।
অর্থনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ করে তিনি বলেন, দেশ থেকে চুরি করে বিদেশে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার করা হবে এবং ভবিষ্যতে কাউকে আর লুটপাট করতে দেওয়া হবে না। জনসভায় ভোটাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারা মানুষের অধিকার রায় সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন জামায়াতের আমির। জামায়াতের আমির বলেন, আমাদের কোনো কার্ড নেই, আপনারাই আমাদের কার্ড। আপনাদের ভালোবাসা, সমর্থন ও দোয়ায় আমরা দয়ার পাত্রমুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই। তিনি দাবি করেন, দেশবাসীকে বিপদের সময় ফেলে তারা কোথাও যাননি, ভবিষ্যতেও যাবেন না। জামায়াতে আমির মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে নীলফামারীর চারটি ও লালমনিরহাটের ৩টি সহ ৭ আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লার প্রতীক তুলে দেন।
লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের আমির ও লালমনিরহাট ৩ (সদর) আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবু তাহের এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আব্দুল হালিম, রংপুর দিনাজপুর অঞ্চলের জামায়াতের সহকারী পরিচালক ও কর্মপরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিম সদস্য নীলফামারী জেলা সাবেক আমির আব্দুর রশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের (জকসু) জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক ডা. নাঈম তাজওয়ার।
আমন্ত্রিত অতিথির মধ্যে বক্তব্য রাখেন, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ফিরোজ কবির, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ন সংগঠক আবু সাঈদ লিওন ও রাসেল আহমেদ, এনসিপির নীলফামারী জেলা কমিটির আহবায়ক আব্দুল মজিদ, এনসিপি লালমনিরহাট জেলার সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক গোলাম ফারুক সরকার সুমন, খেলাফত মজলিসের নীলফামারী জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা সাদ্দাম হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নীলফামারী জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আব্দুস সালাম, লালমনিরহাট জেলা শাখার সভাপতি মুফতি আবুল কাসেম।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, তিস্তাপাড়ের জনসভা প্রস্তুতি কমিটির প্রধান লালমনিরহাট জামায়াত নেতা অধ্যাপক আতাউর রহমান, লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের সাবেক আমির এ্যাডঃ আব্দুল বাতেন, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার ৭টি আসনের প্রার্থী নীলফামারী ১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী ২ (সদর) আসনের প্রার্থী আল ফারুক আব্দুল লতীফ, নীলফামারী ৩ (জলঢাকা) আসনের মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সালাফী, নীলফামারী ৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের আব্দুল মুনতাকিম, লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) আসনের আনোয়ারুল ইসলাম, লালমনিরহাট-২ (কালিগঞ্জ-আদিতমারী) আসনের অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু. নীলফামারীর ডিমলার অমুসলিম শাখার নেতা কৃষ্ণ চন্দ্র, হাতীবান্ধা অমুসলিম শাখার আহবায়ক সনজিৎ কুমার রায়, যুগ্ম আহবায়ক অধ্যক্ষ বিপুল চন্দ্র রায়, সদস্যসচিব পুস্পজিৎ বর্ম্মণ, জামায়াতে ইসলামীর জলঢাকা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত আমির মোঃ কামরুজ্জামান, জামায়াতে ইসলামীর সোশ্যাল এক্টিভিস্ট লেখক আলী আহমাদ মাবরুর, আমার বাংলাদেশ পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য আবু রায়হান আসালী ওয়াসির, নীলফামারী জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক আলতাফ হোসাইন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ইউসুফ আলী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির রংপুর মহানগরের সভাপতি নুরুল হুদা, ইসলামী ছাত্র শিবির নীলফামারী জেলা শাখার সভাপতি তাজমুল হাসান সাগর, লালমনিরহাট জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুল আলম সালেহী প্রমুখ।
এবং নীলফামারীর ডিমলা থেকে সমাবেশে অংশ নিয়েছেন খালেদুল ইসলাম তিনি বলেন, ফজরের নামাজ পড়েই এখানে এসেছি। ইনসাফভিত্তিক রাজনীতি একমাত্র জামায়াতে ইসলামীই প্রতিষ্ঠা করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। হাতিবান্ধা থেকে সমাবেশে আসা রউসুল আলম নামের এক তরুণ ভোটার বলেন, সকাল ৭টা থেকে অপেক্ষা করছি। ইসলামী রাষ্ট্র গঠন এবং আমিরে জামায়াতকে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এখানে আসা। এবং সমাবেশ ঘিরে তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জানা যায়, নীলফামারী ও লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় দুই জেলার নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সমাবেশটি এক বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে।



