Friday, October 2, 2026
Friday, October 2, 2026
Homeবিশেষ প্রতিবেদনঅন্ধকার ভেদ করে আলো ছড়াচ্ছেন মর্জিনা: এক সংগ্রামী নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

অন্ধকার ভেদ করে আলো ছড়াচ্ছেন মর্জিনা: এক সংগ্রামী নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

সুজন আলী, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও)
প্রতিনিধি:

সংসারের টানাপোড়েন আর দাম্পত্য জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে একদিন খালি হাতেই বাবার ভিটায় ফিরেছিলেন মর্জিনা খাতুন। পরকীয়ায় আসক্ত স্বামী মুখ ফিরিয়ে নিলে একমাত্র শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে অসীম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে ভাঙতে পারেনি; বরং সেই ভাঙা জীবনকেই তিনি বানিয়ে নিয়েছেন ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা খেরবাড়ী গ্রামের অবহেলিত মানুষগুলোর কাছে মর্জিনা আজ কেবল এক সংগ্রামী নারীর নাম নয়, তিনি এক অদম্য সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক।
হরিপুর উপজেলার গেদুরা ইউনিয়নের খেরবাড়ী গ্রামের প্রয়াত কৃষক নাসিরউদ্দীনের ছয় মেয়ের মধ্যে মর্জিনা সবার ছোট। পাঁচঘড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বনগাঁ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজে। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন ঐতিহ্যবাহী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে। শিক্ষা শেষে জীবনের স্বাভাবিক গতিতে একটি বীমা কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন।
২০০৮ সালে রংপুরের মমিনপুর গ্রামের মোটর মেকানিক আবু সাঈদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মর্জিনা। কিন্তু সুখের সংসার বেশি দিন টেকেনি। স্বামীর পরকীয়া আসক্তির কারণে ভাঙন ধরে দাম্পত্য জীবনে। বাধ্য হয়ে কন্যাসন্তান মেহেনাজ তাবাসসুম জান্নাতিকে নিয়ে পৈতৃক ভিটায় ফেরেন তিনি। বাবা-মা ততদিনে পরলোকে, নিজস্ব কোনো জমিজমাও ছিল না। সন্তান ও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। মর্জিনা হার না মেনে বর্গা জমিতে কৃষিকাজ শুরু করেন; পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন করে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যান। তাঁর সেই মেয়ে জান্নাতি এখন স্থানীয় স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
তবে মর্জিনার সংগ্রাম শুধু নিজের জীবনের গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। খেরবাড়ী গ্রামটি তখন বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা, বহুবিবাহ ও মাদকের ছোবলে আচ্ছন্ন। আধুনিক সুবিধার আলো পৌঁছায়নি যে গ্রামে, সেখানে সামাজিক এসব ব্যাধি রুখতে এগিয়ে আসেন মর্জিনা। সমাজপতিদের তোপ ও নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ঘরে ঘরে সচেতনতার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করেন।
বেসরকারি সংস্থা ‘মানবকল্যাণ পরিষদ’ (এমকেপি) ও ‘নেটজ বাংলাদেশ’-এর প্রতিনিধি মনিরুজ্জামানের সহযোগিতায় মর্জিনা গঠন করেন ২৫ সদস্যের ‘নাগরিক সমাজ সংগঠন’ (সিএসও)। সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি।
এলাকার পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় কৃষক সোহেল রানা জানান, আগে নিরাপত্তাহীনতা বা মোবাইলের অপব্যবহারের অজুহাতে অভিভাবকরা অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতেন। কিন্তু মর্জিনা ও তাঁর দলের নিয়মিত হস্তক্ষেপে এলাকায় এখন বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন ও বহুবিবাহের হার অনেকটাই কমে এসেছে।
মর্জিনার এই উদ্যোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। গেদুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম বলেন, “মর্জিনার হাত ধরেই আজ খেরবাড়ী গ্রাম মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বেগম রোকেয়ার আদর্শকে ধারণ করে তিনি এলাকায় এক নীরভ সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন।”
আইনি বিচ্ছেদ না হলেও স্বামী হয়তো একদিন ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবেন—এমন একটি সূক্ষ্ম প্রত্যাশা এখনও মর্জিনার মনে লুকিয়ে আছে। তবে সেই ব্যক্তিগত আক্ষেপকে পেছনে ফেলে তিনি আজ এক পুরো গ্রামের অন্ধকার দূর করার মশাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

সম্পর্কিত খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সাম্প্রতিক পোস্ট

সাম্প্রতিক মন্তব্য

%d bloggers like this: