
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে খামারিদের সেবা, প্রশিক্ষণ ও পশুপাখির পরিচর্যা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে নির্ধারিত এলাকায় দায়িত্ব পালন না করে হাসপাতালে বসে পশু চিকিৎসা এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সরকারি দায়িত্ব পালনের নামে অর্থ গ্রহণ, চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চলে হাঁস-মুরগি, গরু ও ছাগলের পরিচর্যা এবং খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকজন প্রকল্পকর্মী নিয়মিত মাঠে যাচ্ছেন না। তাদের কেউ কেউ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে বসে পশু চিকিৎসা করছেন, আবার কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মী সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তাদের একজন দাবি করেছেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার নির্দেশেই তিনি হাসপাতালে আসা পশুর চিকিৎসায় সহায়তা করেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ‘লাইভস্টক ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর’ পদে কর্মরত কায়কোবাদ হোসেনের দায়িত্ব বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচর গ্রাম ও সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চলে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা। তার বিরুদ্ধে নির্ধারিত এলাকায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে বসে গবাদিপশুর চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি নিজেকে পশুচিকিৎসক হিসেবেও পরিচয় দেন।
এ ছাড়া ছাগলের বাচ্চার ক্যাস্ট্রেশন বা খাসি করানোর বিনিময়ে তিনি ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেন বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালটিতে সেবা নিতে আসা কয়েকজন। অভিযোগ রয়েছে, কায়কোবাদ হোসেন ‘সকল প্রকার পোষা প্রাণীর ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা করা হয়’—এমন তথ্যসংবলিত নিজের নামে ছাপানো ভিজিটিং কার্ড হাসপাতালে আসা সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বিতরণ করেন। পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দের ওষুধ ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ে পশু চিকিৎসা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, তার কোনো স্বীকৃত পশুচিকিৎসা সনদ নেই।
জনবলসংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দিয়ে চিকিৎসাসেবার কাজ করানোর অভিযোগের মধ্যে ‘প্রাণিপুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’ প্রকল্পে কর্মরত মো. আলীমুজ্জামান আলীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রকল্পে কর্মরত আলীমুজ্জামান গত তিন মাস ধরে গবাদিপশুর চিকিৎসা দিচ্ছেন। হাসপাতালে অসুস্থ গবাদিপশু নিয়ে আসা কয়েকজন খামারির অভিযোগ, কায়কোবাদ হোসেন তাদের নিজের ভিজিটিং কার্ড দেন। কায়কোবাদ ও আলীমুজ্জামান দুজনই নিজেদের ‘ডাক্তার’ হিসেবে পরিচয় দেন বলে দাবি তাদের।
বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নের চরবর্নি ও মুরালিয়ারচর এলাকায় হাঁস-মুরগির পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন আনোয়ার হোসেন। তার বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি প্রকল্পে কাজ করার পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি ভেটেরিনারি প্রতিষ্ঠানে বিপণন কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেন। তবে একই সঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত প্রকল্পে কাজ করি। তবে ইউএলও স্যারের নির্দেশে অফিসে আসা পশুর চিকিৎসায় সহায়তা করি। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু কিছু পশুর চিকিৎসা করেন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দাপ্তরিক কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবাইকে নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায় না। সকাল ৯টার দিকে অনেকেই অফিসে উপস্থিত থাকেন না এবং দুপুর দেড়টার পরও কয়েকজনকে পাওয়া যায় না। এ হাসপাতালে দপ্তরটিতে কম্পাউন্ডার না থাকলেও ভেটেরিনারি সার্জন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ড্রেসার ও এফএআই পদে জনবল রয়েছে। ড্রেসার মো. আবুল খায়ের প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে অবসরে গেলেও তার নামে বরাদ্দ থাকা হাসপাতালের দোতলার আবাসিক কক্ষে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী বলেন, ‘হাসপাতালের দোতলায় তিনটি কক্ষ রয়েছে, যেগুলো ডরমিটরি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই মুহূর্তে কক্ষগুলো ফাঁকা। এ কারণে আপাতত আমি সেখানে থাকি।’
অপর দিকে কায়কোবাদ হোসেনের নিকট তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নিজের দায়িত্ব ও কাজের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো কথা বলব না। আপনি স্যারের সাথে কথা বলেন।’একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ইউএলও স্যার যেভাবে বলেন, আমি সেভাবেই চলি। তিনি যদি ঘরে আগুন দিতে বলেন, আমি সেটাই করব।’চিকিৎসা-সংক্রান্ত সনদ ছাড়া পশুর চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। অন্যদিকে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী বলেন, দপ্তরে ১১টি পদের বিপরীতে আটটি পদ শূন্য রয়েছে। জনবলসংকটের কারণে বাধ্য হয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দিয়ে কাজ চালাতে হয়। ক্যাস্ট্রেশন করিয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব হাসপাতালেই ক্যাস্ট্রেশন করে টাকা দেওয়া-নেওয়ার একটা প্রচলন আছে। এখানেও আছে। তবে সেবাগ্রহীতারা স্বেচ্ছায় দেন। যদিও আমি নিষেধ করেছি।’কায়কোবাদ হোসেনের অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সে আগে নিত, এখন নেয় না।’উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলীর বিরুদ্ধে প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি এখনো মাঝেমধ্যে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদি এলডিডিপি প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩১ মার্চ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও গাড়িটি কীভাবে ও কোন কর্তৃত্বে ব্যবহার করা হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গাড়িটি গ্যারেজে পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে তাই মাঝে মাঝে সেটা চালানো হয় ।” প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মধ্যে খামারিদের প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নত জাতের ঘাসের চারা বা বীজ বিতরণ অন্যতম। এসব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য প্রাণিসম্পদের উৎপাদন ও পুষ্টির উন্নয়ন এবং খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু প্রকল্পের কর্মীরা নির্ধারিত এলাকায় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত থাকলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আসজাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।



