Wednesday, November 4, 2026
Wednesday, November 4, 2026
Homeবিশেষ প্রতিবেদনউপজেলা ফটকে থামল অসহায় মায়ের কান্না, জন্ম নিল ফুটফুটে নতুন প্রাণ।

উপজেলা ফটকে থামল অসহায় মায়ের কান্না, জন্ম নিল ফুটফুটে নতুন প্রাণ।

সুজন আলী, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও)।

অসহায়ত্বের শেষ সীমানায় এসে যেন এক বুক আশা নিয়ে তারা এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রশাসনের দরজায়। প্রসব বেদনার তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করা মেয়েকে বাঁচাতে তখন একমাত্র সম্বল ছিল বুকফাটা কান্না। অভাবের তাড়নায় যে চিকিৎসার আশা ম্লান হয়ে গিয়েছিল, এক নিমিষেই সেই অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে উঠল মানবতার আলো। ছাত্রদলের তরুণ নেতাকর্মী আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সংবেদনশীল পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখল এক নবজাতক।
বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা পরিষদ চত্বর ও স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে এই মানবিক ও হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার পৌর শহরের নয়নপুর মহল্লার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মাধবী কর্মকারের মেয়ে সাগরিকা। মাত্র কয়েক মাস আগে স্বামীকে হারিয়ে জীবনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন এই তরুণী। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলেও চরম আর্থিক সংকট ও স্বজনহীনতার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েন তার পরিবার। কোনো উপায় না পেয়ে সহায়তার আশায় মেয়েকে নিয়ে তিনি ছোটেন উপজেলা পরিষদে। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রসব বেদনায় কাতরাতে থাকা মেয়ের কষ্ট দেখে উপজেলা পরিষদের মূল ফটকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা মাধবী কর্মকার।
তার সেই হৃদয়বিদারক কান্না নাড়া দেয় পথচারী ও স্থানীয়দের। ঠিক তখনই এগিয়ে আসেন উপজেলা ছাত্রদলের নেতা রাব্বি হোসেনসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা। অসহায় মায়ের আর্তনাদ শুনে এক মুহূর্তও দেরি না করে তারা দ্রুত সাগরিকাকে উদ্ধার করে স্থানীয় মাতৃসেবা ক্লিনিকে ভর্তি করেন। একই সঙ্গে বিষয়টি জানানো হয় উপজেলা প্রশাসনকে।
খবর পাওয়া মাত্রই কালবিলম্ব না করে ক্লিনিকে ছুটে যান রাণীশংকৈলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ ইশরাত জাহান। সেখানে চিকিৎসাধীন সাগরিকার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
প্রশাসন ও যুবসমাজের এই যৌথ উদ্যোগে অবশেষে অবসান ঘটে চরম অনিশ্চয়তার। নিরাপদ প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে সন্তান।
পুরো ঘটনাটির অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে ছাত্রদল নেতা রাব্বি হোসেন বলেন, “মাধবী মাসির কান্নার শব্দ শুনে আমরা আর স্থির থাকতে পারিনি। সাগরিকার অবস্থা জানার পর দ্রুত তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করি এবং ইউএনও মহোদয়কে অবহিত করি। এমন একটি মানবিক কাজের অংশ হতে পেরে আমাদের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ ইশরাত জাহান বলেন, “অন্তঃসত্ত্বা সাগরিকার অসহায়ত্বের কথা শোনামাত্রই আমি ক্লিনিকে ছুটে যাই। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে তার সুচিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি এবং ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা সহায়তা করেছি। বিশেষ করে আমাদের ছাত্র ভাইয়েরা অত্যন্ত চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে প্রশাসন ও যুবসমাজ এভাবেই ভবিষ্যতেও একসঙ্গে কাজ করবে।”
নবজাতকের নিরাপদ জন্ম ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা হওয়ায় অশ্রুসজল চোখে ইউএনও এবং ছাত্রদল নেতাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নবজাতকের নানি মাধবী কর্মকার। এই মহৎ উদ্যোগে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলীসহ স্থানীয় ছাত্রদলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী।
অভাবের কষাঘাত আর নির্মম বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে প্রশাসনের মানবিক নেতৃত্ব ও তারুণ্যের উষ্ণ ছোঁয়ায় রাণীশংকৈলে আজ রচিত হলো এক অনন্য মানবিক উপাখ্যান।

সম্পর্কিত খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সাম্প্রতিক পোস্ট

সাম্প্রতিক মন্তব্য

%d bloggers like this: