
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে সরকারের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক, ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো আগামী দিনে বিনিয়োগ পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের আগে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর বাংলাদেশে বহু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় দুর্বলই থেকে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন নিশ্চয়তা। যদি সত্যিই ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়, তাহলে তা কর ছাড়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই প্যাকেজ দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়াগত বাধাগুলো দূর করতে সক্ষম হতে পারে। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার মূল নির্ধারক হলো প্রশাসনিক সংস্কার, অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা নয়।
বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী, বিশ্লেষক, বিএনপি নেতা মাহবুব চৌধুরী বলেন, সরকার ঘোষিত চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) সংস্কার প্যাকেজকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এতে ব্যবসা সহজ করা, ডিজিটাল সেবা বাড়ানো এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি সেবা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সতর্কতা যে, পরিকল্পনা যতই ভালো হোক, এর বাস্তব ফল নির্ভর করবে প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা ওয়েবসাইট চালু করা যেখানে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ ও অগ্রগতি ট্র্যাক করতে পারেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, শুধু নিয়মকানুন সহজ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার অনিশ্চয়তা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা থাকলে সহজ লাইসেন্সিং যথেষ্ট নয়।
সরকারের এই সংস্কার পরিকল্পনায় মূল লক্ষ্য হলো অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসার খরচ ও অনিশ্চয়তা হ্রাস করা, তবে জননিরাপত্তা, পরিবেশ ও রাজস্ব সুরক্ষা বজায় রাখা।
এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স, অনুমোদন ও আবেদন ট্র্যাকিং এক জায়গায় করা যাবে। সরকার বলছে, সঠিকভাবে আবেদন জমা দিলে অধিকাংশ সেবা সাত দিনের মধ্যেই দেওয়া হবে।
এছাড়া সব অনুমোদনকারী সংস্থার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা (‘সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট’) বাধ্যতামূলক করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাড়া না দিলে কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনও কার্যকর হতে পারে। কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরো দ্রুত হবে— নাম অনুমোদন, ফি পরিশোধ ও সনদ ইস্যু সবকিছু অনলাইনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হবে।
নতুন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো প্রাথমিকভাবে অনলাইন প্রভিশনাল অনুমোদন পাবে, যেন তারা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারে এবং পরে ৬–১২ মাসের মধ্যে পূর্ণ নিয়ম মেনে চলতে পারবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে—কর্মী অনুমতি ৭ দিনের মধ্যে, বিনিয়োগ ভিসা ১০ দিনের মধ্যে এবং পাঁচ বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিএসসিআইসি)-এর মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা। এছাড়াও একটি ২৪-ঘণ্টার বিনিয়োগকারী হেল্প ডেস্ক এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
সরকার দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনি সুরক্ষা জোরদার করার পরিকল্পনাও করছে।
স্থানীয় পর্যায়ের ট্রেড লাইসেন্স সেবা ধীরে ধীরে জাতীয় প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে, যেন অনলাইনে আবেদন, নবায়ন ও পেমেন্ট সম্ভব হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ শিল্পাঞ্চল—যেখানে জমি, বিদ্যুৎ, পানি ও প্রাথমিক অনুমোদন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকবে, ফলে কারখানা স্থাপন দ্রুত হবে। লাভ ও মূলধন প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রফিট রিপ্যাট্রিয়েশন আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের টাকা অ্যাকাউন্টের (এনআইটিএ) মাধ্যমে ক্রয়কৃত সিকিউরিটিজ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দেশে ফেরত আনা এবং পুনঃবিনিয়োগের প্রক্রিয়াকে এরই মধ্যে সহজ করেছে। এর জন্য নিরীক্ষকের সনদপত্রের আবশ্যকতা দূর করা হয়েছে, যার ফলে এখন মাত্র এক কর্মদিবসের মধ্যেই লেনদেন সম্পন্ন করা যায়।
নিবন্ধিত নয় এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মূল্যায়ন রিপোর্ট বাধ্যতামূলক থাকবে না এবং বড় অঙ্কের লেনদেনেও বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদনের শর্ত শিথিল করা হচ্ছে।
সরকার ডকুমেন্টস এগেইনস্ট পেমেন্ট (ডি/পি) এবং টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার (টিটি) সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য আমদানিকারকদের জন্য বাধ্যতামূলক লেটার-অব-ক্রেডিটের প্রয়োজনীয়তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করার এবং বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেন সহজ করার পরিকল্পনা করছে।
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ব্যবস্থা উন্নয়ন, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়ানো এবং ডিজিটাল ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণ অনুমোদন ব্যবস্থাতেও বড় সংস্কার আনা হচ্ছে—পরিবেশ ছাড়পত্র, ফায়ার সেফটি, জমি ও বিল্ডিং অনুমোদন একক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনা হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পগুলো দ্রুত অনুমোদনের জন্য নতুন রিস্ক-বেইজড পদ্ধতি চালু করা হবে।


