
মো: জাহিদুল ইসলাম,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি।
তিস্তার পানি তিস্তাপারের মানুষের ‘বাঁচা-মরার’ বিষয় উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির জন্য ভারতের অপেক্ষায় থাকতে চায় না বাংলাদেশ সরকার।বরং এই প্রান্তের উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে চীনের সঙ্গে আলোচনা চালাতে আগ্রহী। ভারত থেকে পুশ ইনের ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার চীন সফরে যাওয়ার আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি সরকারের এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
গতকালই তিনি চীন সফরে গেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বেইজিং সফরে ‘অবশ্যই’ আলোচনা হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধায় ২০১১ সাল থেকে আটকে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে ঢাকার আশা নিয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারতের উদ্যোগের জন্য ঢাকা বসে থাকতে চায় না। তিনি বলেন, “দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে এখনো সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং তাঁরা কী ভাবছেন, কী করবেন, সেটা তাঁরা যদি না জানান, তাঁদের ‘মাইন্ড রিড’ করার কাজ আমার না।
প্রত্যাশা থাকবে, যাতে করে এই চুক্তিটা যেটা হয়েছিল তখন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা ‘কনসিডার’ করতে পারি কি-না। কিন্তু সে জন্য তো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে। চীন সফরের উদ্দেশ্য ও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “চীন আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বন্ধু দেশ, যার সঙ্গে ‘স্ট্রাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে আমাদের সম্পর্ক। এবং আমাদের নতুন সরকারের তরফ থেকে এটা হচ্ছে চীনে প্রথম সফর।
তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এই সফরে আমরা আমাদের দুই দেশের সম্পর্ককে আরো দ্রুত এবং আরো গভীর এবং ব্যপ্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। তিনি বলেন, “ইতিমধ্যেই আমরা চীনের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক পারস্পরিক সহযোগিতামূলক প্রকল্প এবং কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছি। এই সম্পর্কটাকে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের’ চাইতে ওপরে নেওয়া যায় কি না, সে নিয়ে আমরা আলোচনা করব। তাদেরও আগ্রহ আছে। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আপনি তিস্তার কথা বললেন, অবশ্যই তিস্তার কথা হবে, অবশ্যই।
এইটা আমাদের সেই উত্তর অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়। তারা ডাক দিয়েছে ‘জাগো বাহে’। সেই ডাকে যদি আমরা সাড়া না দিই, তাহলে পরে আমরা আছি কেন? এটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার, সেই অঞ্চলের সমস্যা সুরাহা করার এবং এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার আমরা পূরণ করব এবং চীন সফরে এই বিষয়টি আমরা নিশ্চয় আলোচনা করব। চীনের প্রকল্প এবং ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি দুটি ভিন্ন বিষয়কে এক করে দেখা প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা যেটা হচ্ছে, তিস্তাপারের মানুষের একটা বড় ধরনের ‘ইকোলজিক্যাল’ বিপর্যয়ের মধ্যে তারা আছে, এটা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। আমরা যেভাবে পারি, যে কয়টা উপায় আছে, সব উপায় আমরা যাচাই করব। যেটা সর্বোত্তম, সেটাই আমরা নিব। এখানে সবচাইতে বড় আপনার বিচার্য বিষয় হচ্ছে, আমাদের মানুষের ‘ইন্টারেস্ট’, বাংলাদেশ ‘ফার্স্ট’।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানিসম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছিল। মনমোহনের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তাচুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি।
ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ শীর্ষক এ প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে এটিসহ আরো কয়েকটি প্রকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছিলেন বলে ওই সময় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। তিস্তা প্রকল্পে নদীর তীর ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানিসংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে সে সময় এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বিবিসি। এ প্রকল্পে চীনা কম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকাকে নয়াদিল্লির উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্রসচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়। এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ আগস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান তিনি। এর মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উত্তরবঙ্গে বড় ধরনের কিছু কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সেই আন্দোলনে মূল ভূমিকায় থাকা বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, ওই আন্দোলনের নেতা আসাদুল হাবিব দুলু রয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর দায়িত্বে।
তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি এবং প্রকল্প দুটিই ঝুলে থাকার মধ্যে গতকাল তিন দিনের সফরে বেইজিং গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি চীনের ‘পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের’ চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তাঁর। পুশ ইনের ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেব, পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলাদেশবিদ্বেষী বিভিন্ন বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ইনের আশঙ্কা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী এ কথাটি বলেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তিনি কিছু কাজ করেছেন, আপনারা দেখেছেন আমরা সেটাকে কড়া প্রতিবাদ দিয়েছি। সে বিষয়ে আমাদের যা যা ব্যবস্থা আমরা নেব।


