
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরাই পাকিস্তান সরকারে প্রাধান্য পান। পাকিস্তান সরকার ঠিক করে উর্দু ভাষাকে সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করা হবে, যদিও পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুভাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা মাত্র ৪ জন। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ এই সিদ্ধান্তকে মোটেই মেনে নিতে চাননি। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। উপস্থিত জনতা তার এই ঘোষণার বিরোধিতা করে। পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন। সেই গণআন্দোলনের সূচনা, বিকাশ, পরিণতি এবং সাফল্যের এই চারটি পর্বেই যারা বিশেষ অবদান রাখেন তারা হলেন- তমদ্দুন মজলিসের সভাপতি প্রিন্সিপাল অধ্যাপক আবুল কাশেম এবং তার সহযোগী ছিলেন অধ্যাপক ড. এ এস এম নূরুল হক ভূঁইয়া, শাহেদ আলী, বদরুদ্দীন ওমর, শামসুল আলম, কাজী গোলাম মাহবুব, আলী আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, অধ্যাপক আবদুল গফুর প্রমুখ।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানের সভায় রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে বলে জানালে উপস্থিত ছাত্র-জনতা এর প্রতিবাদ করে। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মঘট পালন করে। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের এক সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কৌশল হিসেবে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব পেশ করে। এর বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানায় পূর্ব পাকিস্তানের সর্বমহল। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কর্মসূচির আয়োজন চলার সময় সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে কি না এ প্রশ্নে সভায় দ্বিমত দেখা দেয়, তবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সংকল্পে অটুট থাকে। পরদিন সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাংশে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। সভা শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকসহ উপাচার্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন। তবে ছাত্র নেতারা, বিশেষ করে আবদুল মতিন এবং গাজীউল হক নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়। ছাত্ররা পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিপেটা করে, গুলি চালায়। গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, আবদুস সালাম মারা যান। অহিউল্লাহ নামে আট/নয় বছরের এক কিশোরও সেদিন নিহত হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার সমমর্যাদা দিতে। এই আন্দোলনের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ঠিক সেই জায়গাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন রফিক, বরকত, জব্বার- সেখানে গড়ে তোলা হয় শহীদ মিনার।
২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলাদেশে শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে প্রায় ১৯৩টি দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়ে থাকে। রাজপথে মাতৃভাষার আন্দোলনের উচ্চকিত শ্লোগানের একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন মৌলভীবাজারের শেখ মো. বদরুজ্জামান। ওই সময় তিনি ছিলেন সিলেট এমসি কলেজের শিক্ষার্থী। ১৯৪৯ সালে হবিগঞ্জ জেলাধীন নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন (এসেসসি) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি এমসি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।
১৯৩২ সালের ১লা মার্চ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মিরপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত ও জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএম কিবরিয়া সাহেবের পরিবারে। শৈশবে মাকে হারানো ছেলে বদরুজ্জামানকে লালন-পালন করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাঁর মামাতো বোন। বদরুজ্জামানের পিতা মাওলানা শেখ ইলিয়াস হোসাইন মৌলভীবাজার শহরের আদালত সড়কে আলাউদ্দিন মাদ্রাসার শিক্ষকতা করতেন বিধায় সেই প্রতিষ্ঠানেই বদরুজ্জামানের শিক্ষা জীবনের শুরু। নিজবাড়ি থেকে স্কুলটির দূরত্ব বেশি হওয়ায় মামাতো ভাই আব্দুল মান্নান (দারগা সাহেব) সাধুহাটিতে বদরুজ্জামানকে ভর্তি করেন। পরের বছর আউশকান্দি রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন স্থানে মেধাবী ছাত্র সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েন এবং সেই সূত্রে বদরুজ্জামানকে সেই স্কুলে ভর্তি করা হয়। লজিং এর ব্যবস্থা করা হয় সাবেক অর্থমন্ত্রীর কিবরিয়া সাহেবের ফুফুর ঘরে। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ফুটবল খেলায়ও তিনি খুবই কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন ক্রীড়া সংগঠক। তিনি বিভিন্ন উপজেলায় রেফারির দায়িত্ব সুনামের সাথে পালন করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরই চাচাতো ভাই আবু তাহির মিয়াকেও দক্ষ রেফারি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৪৯ সনের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শাহ এএসএম কিবরিয়া সাহেব তাকে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি করেন, কিন্তু পরবর্তীতে মামাতো ভাই তাকে এমসি কলেজে ভর্তি করেন। শুরু হল উচ্চমাধ্যমিক ক্লাসের পড়াশুনা। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন সিলেট এমসি কলেজে তিনি। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে শুরু হয় মহান ভাষা আন্দোলন। সিলেট শহরে বিভিন্ন জনসভা, মিছিল শুরু হলে তিনিও তাতে যোগ দিতে থাকেন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে দেওয়ান আজরফের আহ্বানে তিনি ঢাকা চলে যান।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ছাত্র মিছিলে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর চোখের সামনেই পুলিশের গুলিতে অনেক ভাই শাহাদাত বরণ করেন। দৈনিক সৈনিক, নও বেলাল, যুগভেরী পত্রিকায় মাঝেমধ্যে তিনি লিখতেন। তমদ্দুন মজলিশের সাথে আমৃত্যু সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৮৭ সালে ভাষাসৈনিক কৃষিবিদ বদরুজ্জামান অবসর গ্রহণ করেন। ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান চাকরি থাকাকালীন ও পরবর্তী অবসরকালীন সময়ে সামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে অবদান রেখেছেন। আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
(লেখক: সাবেক প্রিন্সিপাল, মদন মোহন কলেজ, সিলেট)



