
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, এ নিয়ে জনমনে কৌতূহলের শেষ নেই। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতার পাশাপাশি দলের বাইরেও দু-একজনের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে আলোচনায় আছে। তবে প্রকৃত অর্থে কে ওই পদে মনোনয়ন পাবেন, তা নির্ভর করছে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত সময়ে বিএনপির মনোনীত তিনজন রাষ্ট্রপতির বিষয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের অভিজ্ঞতা আছে দলটির সামনে। ফলে ওই অভিজ্ঞতার আলোকেই এবার দলটি সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের এখতিয়ার বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর থাকলেও প্রয়োজনে তিনি স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেও এ বিষয়ে পরামর্শ করতে পারেন। বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই গ্রহণ করা হবে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রেখেই আমরা দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চাই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। জানা যায়, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু এখনই এ নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে-কে হচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
পাশাপাশি বিএনপিই বা কেমন রাষ্ট্রপতি চায়, সেদিকেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি সচেতন জনগোষ্ঠীর নজর রয়েছে। বলা হচ্ছে, মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতি আনুগত্য বা বিশ্বাসযোগ্যতার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির দক্ষতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্নে অতীতের ভালো এবং তিক্ত-দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, আগের রাষ্ট্রপতিদের মতো নয়, বরং তাদের থেকে ভিন্নধারার ও যোগ্য একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচন করা প্রয়োজন। বিগত রাষ্ট্রপতিদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের আগের রাষ্ট্রপতিদের যোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল এবং তারা কেউ কেউ যথেষ্ট মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না।’ আদর্শ রাষ্ট্রপতির যোগ্যতা প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি ও প্রধান নাগরিক। তাই এই পদে একজন সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন, মানসম্মত ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে বসানো উচিত। সরকার দেশের স্বার্থে একজন উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেবে, তেমনটাই প্রত্যাশা থাকবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, নিছক রাজনৈতিক বিচারে বা দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়া সমীচীন নয়। যদিও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত, তবুও জাতীয় সংকট বা জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান পদে এমন একজন ব্যক্তিত্ব আনা প্রয়োজন, যার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যিনি সত্যি সত্যি দেশের অভিভাবক হতে পারবেন, তাকেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি করা উচিত।’ তার মতে, ‘২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে কী ধরনের রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত, কীভাবে হওয়া উচিত, সেটা তো জুলাই সনদের মধ্যে বলা আছে। আমি বলব, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হোক। কিন্তু সেটাও তো হবে না। কারণ, উচ্চকক্ষ হচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি আগের নিয়মেই হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দেশের রাষ্ট্রপতি হতে হবে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি পদটি যেন কোনো দলীয় অন্ধ আনুগত্য বা কানাঘুষার কেন্দ্রবিন্দু না হয়। যিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হবেন; জনগণ, দেশ এবং সংবিধানের প্রতি তার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বিশেষ করে, যে কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাকে শক্ত ও অনড় অবস্থান নিতে হবে। অতীতে আমরা রাজনীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রপতি খুব কমই দেখেছি। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে, মানুষ দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে সক্ষম-এমন একজন নিরপেক্ষ ও যোগ্য রাষ্ট্রপতিই প্রত্যাশা করে।’
বিএনপি নেতা, ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রাত্তন কেন্দ্রীয় নেতা, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রপতি শুধু আনুষ্ঠানিক পদ নয়। বি. চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে বিএনপিকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অন্যদিকে, অদক্ষতার কারণে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভুলের সুযোগ নেই। কারণ, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সংকটে এ পদটির গুরুত্ব বেড়ে যায়।সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি বেছে নেবে। যিনি দক্ষ, বিজ্ঞ, সাহসী ও দেশের প্রতি যার আনুগত্য রয়েছে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ২২ জন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে বিতর্কের মুখে পদত্যাগ করেছেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তবে সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও আওয়ামী লীগের বিবেচনায় তিনি ছিলেন ‘বিশ্বাসঘাতক’। এছাড়া সদ্য বিদায়ি মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হলেও গণ-অভ্যুত্থানে বিতাড়িত শেখ হাসিনার প্রতি তার দুর্বলতা দেশের মানুষ ভালোভোবে নেয়নি। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, রাষ্ট্রপতির যে সম্মান বা মর্যাদা, তা মো. সাহাবুদ্দিন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে অতীতের সব ঘটনা বিশ্লেষণ করেই এবার রাষ্ট্রপতি পদে একজনকে বসাতে চায় বিএনপি। তাছাড়া এ প্রশ্নে যতটা সম্ভব বিতর্কও এড়াতে চায় দলটি।



